দীর্ঘস্থায়ী এ অস্থিরতা ইউরোপের দেশগুলোর উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। করোনা মহামারীর ধকল, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের পর এখন মধ্যপ্রাচ্যের এ নতুন সংঘাত কাঁচামালের দাম বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। খবর রয়টার্স।
জার্মানির বিখ্যাত রাসায়নিক কোম্পানি ‘গেশেম’ বর্তমানে এ সংকটের একটি বড় উদাহরণ। গৃহস্থালি পরিষ্কারক পণ্য এবং গাড়ির ব্রেক ফ্লুইড তৈরি করা এ প্রতিষ্ঠানের মুনাফা প্রতি বছরই কমছে। গেশেমের মালিক মার্টিনা নিগসোয়াঙ্গার জানান, পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ব্যবসায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। গত ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটি কর্মী ছাঁটাই এবং নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করার কথা ভাবছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এ সংকটের প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়লেও ইউরোপের দেশগুলোয় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। কারণ এ অঞ্চলে জ্বালানি তেলের দাম আগে থেকেই অনেক বেশি ছিল। ইরান ও কাতারের গ্যাস স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলার পর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৬ সালের শুরুর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তবে আগামী দুই বছরে জার্মানির অর্থনীতি প্রায় ৪ হাজার কোটি ইউরো ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। সস্তা জ্বালানি তেলের অভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে ইউরোপের শিল্প খাত এখন চরম ঝুঁকির মুখে। বর্তমানে জার্মানিতে বিদ্যুতের পাইকারি দাম যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
যুদ্ধের কারণে শুধু জ্বালানি তেলও নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সার, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক তৈরির উপকরণের দাম অনেক বেড়ে গেছে। অনেক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে হঠাৎ করে বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গত এক বছরে জার্মানিতে রেকর্ডসংখ্যক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে।
বড় কোম্পানিগুলোও এ চাপ সহ্য করতে পারছে না। ল্যানক্সেস, বিএএসএফের মতো বিশ্বখ্যাত রাসায়নিক প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই এবং পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফ্রান্স ও ডেনমার্কের প্লাস্টিক ও খেলনা নির্মাতারা জানিয়েছেন, এশিয়ার সরবরাহকারীরা পণ্য পাঠাতে অপরাগতা প্রকাশ করায় তাদের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিখ্যাত খেলনা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান লেগো জানিয়েছে, তারা জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজলেও বাজারের এ অস্থিরতা তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরো ভয়াবহ হবে। ইউরোপীয় সরকারগুলোর পক্ষে এখন শিল্প খাতকে বিশাল ভর্তুকি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবস্থা করতে না পারলে ইউরোপের শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারে।